বুধবার, ৩ মে, ২০২৩

CNC মেশিনের কাটিং টুল

যে কোন মেশিনিং অপারেশানেই কাটিং টুল একটি খুবই গুরুত্বপুর্ন ভূমিকা পালন করে এবং এই কাটিং টুলের উপরেই ওয়ার্কপিসের ফিনিশিং বহুলাংশে নির্ভর করে। আলাদা আলাদা মেশিনিং এর প্রয়োজন অনুসারে কাটিং টুলও বিভিন্ন ধরনের ও বিভিন্ন আকারের হয়। এখানে শুধুমাত্র CNC মিলিং এবং CNC টার্নিং মেশিনে বহুল ব্যাবহৃত কিছু কমন মেটাল কাটিং টুল সম্মন্ধে আলোচনা করা হয়েছে। এছাড়াও কিছু বিশেষ ধরনের কাটিং টুল যেগুলিকে ফর্ম কাটিং টুল বলা হয়, CNC মেশিনে ব্যাবহৃত হয়ে থাকে (যদিও এই ধরনের কাটিং টুলের ব্যাবহার সীমিত)। CNC মিলিং এবং CNC টার্নিং মেশিনে ব্যাবহৃত কমন কাটিং টুলগুলি হল নিম্নরূপ।

  • মিলিং টুল ও টুল হোল্ডার
  • টার্নিং টুল ও বোরিং টুল
  • ড্রিল, ট্যাপ এবং রিমার

মিলিং টুল

মিলিং টুল সাধারনত একটি মাল্টি-এজ (Multi-edge ) কাটিং টুল। অর্থাৎ এই ধরনের কাটিং টুলের অনেকগুলি কাটিং এজ থাকে এবং এগুলি স্থির ওয়ার্কপিসের তুলনায় ঘুরন্ত অবস্থায় রিলেটিভ মুভমেন্টের সাহায্যে ওয়ার্কপিস থেকে মেটেরিয়াল রিমুভ করে। নিচে CNC মেশিনে ব্যাবহৃত একটি সাধারন মিলিং টুলের ছবি দেওয়া হল।

উপরের ছবি অনুযায়ী মিলিং টুলকে সাধারনত একটি টুল হোল্ডারের মধ্যে লেংথ অ্যাডজাস্টমেন্ট স্ক্রুর সাহায্যে আটকানো থাকে এবং এটির সাহায্যে টুলের লেংথও কম বেশী করা যায়। মিলিং টুল আবার বিভিন্ন প্রকারের হয়, তবে সবথেকে কমন মিলিং টুল বলতে সাধারনত এন্ডমিল কাটারকে (End Mill Cutter) বোঝায়। সাধারন এন্ডমিল কাটার প্রধানত দুই ধরনের হয়, এগুলি হল সেন্টার কাটিং এবং নন-সেন্টার কাটিং এন্ডমিল কাটার। নিচে ছবির সাহায্যে দুই ধরনের এন্ডমিল কাটারের মধ্যে পার্থক্য বোঝানো হল।

এছাড়াও আরো বিভিন্ন ধরনের এন্ডমিল কাটার পাওয়া যায়, নিচে কিছু কমন এন্ডমিল কাটারের তালিকা দেওয়া হল।

সেন্টার কাটিং এন্ডমিল কাটার- এই ধরনের কাটারের সেন্টার এবং ধার বা এজ এই দুইদিকেই কাটিং এজ রয়েছে এবং এগুলিকে সাধারনত প্লাঞ্জ-মিলিং অপারেশানের জন্য ব্যাবহার করা হয়।

নন-সেন্টার কাটিং এন্ডমিল কাটার- এই ধরনের কাটারের শুধুমাত্র ধার বা এজ বরাবর কাটিং এজ রয়েছে এবং এগুলিকে সাধারনত সাইড-মিলিং অপারেশানের জন্য ব্যাবহার করা হয়।

রাফ এন্ডমিল কাটার- এর সাহায্যে একসাথে বেশী পরিমানের মেটেরিয়াল রিমুভ করা হয়, সেই কারনে এই ধরনের এন্ডমিল কাটারের ধার বা এজ রাফ করা থাকে এবং ফলে ভাইব্রেশানও কম হয়।

বল-এন্ডমিল কাটার - এগুলিকে সাধারনত খুব পাতলা স্লটিং এবং কন্ট্যুর (Contour) মিলিং ইত্যাদির কাজে ব্যাবহার করা হয়।

ইন্ডেক্সেবল এন্ড মিল কাটার – এই ধরনের এন্ড মিল কাটারে পুনঃব্যাবহারযোগ্য বা রিপ্লেসেবল কারবাইড ইনসার্ট (Replaceable Carbide Insert) ব্যাবহার করা হয়, ফলে সলিড এন্ডমিল কাটারের তুলনায় এক্ষেত্রে পয়সার সাশ্রয় হয়। সাধারনত রাফ মিলিং এর জন্য এই ধরনের এন্ডমিল ব্যাবহৃত হয়ে থাকে।

এছাড়া এক ধরনের মিলিং টুল ব্যাবহৃত হয় যাকে ফেস মিল বলা হয়। এই ধরনের মিলিং টুলে একটি বড় ডায়ামিটারের সলিড বডির উপরে মাল্টিপল কারবাইড ইনসার্ট (Multiple Carbide Insert) স্ক্রুর সাহায্যে আটকানো থাকে। এর ফলে ওয়ার্কপিসের বড় সারফেস এরিয়া সহজেই একবারে মেশিনিং করা সম্ভব হয়। এই ধরনের টুলের কারবাইড ইনসার্টগুলি পুনঃব্যাবহারযোগ্য বা রিপ্লেসেবল হওয়ার জন্য কোন একটি ইনসার্ট খারাপ হয়ে গেলে সহজেই তা পরিবর্তন করা সম্ভব। নিচে CNC মেশিনে ব্যাবহৃত বিভিন্ন ধরনের এন্ডমিল কাটারের ছবি দেওয়া হল।  

মিলিং টুল হোল্ডার এবং তার গঠন

CNC মেশিনে মিলিং অপারেশানের ক্ষেত্রে সাধারনত কাটিং টুলকে বিশেষ ধরনের টুল হোল্ডারের মধ্যে বসিয়ে স্পিন্ডলে ক্ল্যাম্প করানো হয়। এই টুল হোল্ডার আবার গঠনের এবং স্পিন্ডলে ক্ল্যাম্পিং ব্যাবস্থার উপর নির্ভর করে বিভিন্ন ধরনের হয় অর্থাৎ স্পিন্ডলের গঠনের উপর নির্ভর করে টুল হোল্ডার নির্বাচন করা হয়ে থাকে। সবথেকে প্রচলিত টুল হোল্ডার টাইপ দুটি হল CAT Flange টাইপ এবং BT Flange টাইপ। বেশীরভাগ CNC  মিলিং মেশিনে এই দুই ধরনের টুল হোল্ডারই ব্যাবহার করা হয়, এবং এগুলির গঠন মোটামুটি একই রকমের হয়, শুধুমাত্র Flange Style এবং ডাইমেনশানের দিক থেকে এদের মধ্যে কিছু পার্থক্য দেখা যায়। CAT বা BT টাইপ টুল হোল্ডারের পেছনে “Pull Stud” নামক এক ধরনের ক্ল্যাম্পিং ব্যাবস্থা থাকে, যার সাহায্যে টুল হোল্ডারকে স্পীন্ডলের মধ্যে দৃঢ়ভাবে ক্ল্যাম্প করে রাখা হয়। বর্তমানে HSK নামে আরও এক বিশেষ ধরনের টুল হোল্ডার ব্যাবহার করা হয়, যেগুলির ভিতরের দিকটা ফাঁপা থাকে এবং তুলনামুলক অনেক হাল্কা হয়। এই ধরনের টুল হোল্ডার মূলত হাই-স্পিড মেশিনিং এর জন্য ব্যাবহার করা হয় এবং এই HSK টুল হোল্ডারের গঠন CAT ও BT টাইপ হোল্ডারের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে থাকে। নিচে দুই ধরনের টুল হোল্ডার দেখানো হল।    

 

টার্নিং টুল ও বোরিং বার

টার্নিং টুল সাধারনত একটি সিংগল-পয়েন্ট (Single-Point ) কাটিং টুল। অর্থাৎ এই ধরনের কাটিং টুলের একটিই মাত্র কাটিং এজ থাকে এবং এগুলি ঘুরন্ত ওয়ার্কপিসের তুলনায় স্থির অবস্থায় রিলেটিভ মুভমেন্টের সাহায্যে ওয়ার্কপিস থেকে মেটেরিয়াল রিমুভ করে। বেশীরভাগ টার্নিং টুলেই পুনঃব্যাবহারযোগ্য বা রিপ্লেসেবল কারবাইড ইনসার্ট ব্যাবহার করা হয়, এবং ইনসার্টের একদিকের কাটিং এজ খারাপ হয়ে গেলে সেটিকে ঘুরিয়ে অন্যান্য কাটিং এজ ব্যাবহার করা হয়ে থাকে। টার্নিং ইনসার্ট আবার মেশিনিং এর ধরন অনুসারে কাটিং এজের আকার নির্ভর করে, এবং বিভিন্ন ডিজাইনের হয়। নিচে একটি সাধারন টার্নিং টুলের ছবি দেওয়া হল।   

উপরের ছবি অনুযায়ী একটি টার্নিং টুলের মূলত দুটি অংশ রয়েছে, প্রথমটি টুল হোল্ডার ও অপরটি ইনসার্ট। টুল হোল্ডার সাধারনত ফোর্জড স্টিলের হয় এবং এটি ইনসার্টকে স্ক্রু এবং ক্ল্যাম্পের সাহায্যে দৃঢ়ভাবে আটকে রাখে যাতে কিনা মেশিনিং এর সময় উৎপন্ন ভাইব্রেশানে ইনসার্টের কোনরূপ বিচ্যুতি না ঘটে। বর্তমানে প্রায় বেশিরভাগ মেশিনিং অপারেশানেই ইনসার্ট ব্যাবহার করা হয়। ইনসার্ট সাধারনত সিমেন্টেড কার্বাইড, সেরামিক অথবা কারমেট (সেরামিক ও মেটালের কম্পোজিট মেটেরিয়াল) দিয়ে তৈরি করা হয়। ইনসার্ট দুই প্রকারের হয়ে থাকে, কোটেড এবং আন-কোটেড। ইনসার্টের হার্ডনেস বাড়ানোর জন্যই প্রধানত এগুলিকে কোটিং করা হয় এবং টাংস্টেন, টাইটেনিয়াম ইত্যাদির যৌগ এই উদ্দেশ্যে ব্যাবহার করা হয়। লোহা বা ঐ ধরনের হার্ড মেটেরিয়ালকে মেশিনিং এর জন্য সাধারনত কোটেড-ইনসার্ট এবং অ্যালুমিনিয়াম বা ঐ ধরনের সফট মেটেরিয়ালকে মেশিনিং এর জন্য আন-কোটেড-ইনসার্ট ব্যাবহার করা হয়ে থাকে।

আগেই বলা হয়েছে মেশিনিং এর ধরন অনুসারে ইনসার্টের কাটিং এজের আকার নির্ভর করে। তাই রাফ টার্নিং এর জন্য ইনসার্টের কাটিং এজের পয়েন্ট অ্যাঙ্গেল বেশী হয় এবং ফিনিশ টার্নিং এর জন্য ইনসার্টের কাটিং এজের পয়েন্ট অ্যাঙ্গেল কম হয়। পয়েন্ট অ্যাঙ্গেল বেশী হলে ইনসার্টটিও অনেক দৃঢ় ও অনেক বেশী কাটিং লোড নিতে সক্ষম হয়, কিন্ত ফিনিশ টার্নিং অপারেশানের জন্য ইনসার্টের কাটিং এজের পয়েন্ট অ্যাঙ্গেল কম করার প্রয়োজন হয় এবং এক্ষেত্রে ইনসার্টের উপরও খুব কম লোড দেওয়া হয়। ইনসার্টে সাধারনত চিপ-ব্রেকার নামক একটি ব্যাবস্থা রাখা হয়, যাতে কিনা মেশিনিং এর ফলে উৎপন্ন চিপসগুলি লম্বা হওয়ার পরিবর্তে ছোট ছোট টুকরোতে ভেঙ্গে যায়। নিচে দুই ধরনের ইনসার্টের ছবি দেওয়া হল।


বোরিং বারও টার্নিং টুলের মতনই সিংগল-পয়েন্ট (Single-Point ) কাটিং টুল। এখানে টুল হোল্ডারের পরিবর্তে সিলিন্ড্রিক্যাল বার ব্যাবহার করা হয় এবং ইনসার্টকে ঐ বারের মাথায় একটি বিশেষ অ্যাঙ্গেলে বা ডিজাইনে বসানো হয়। বোরিং বারের সাহায্যে সাধারনত সিলিন্ড্রিক্যাল ওয়ার্কপিসের ইন্টারনাল টার্নিং, ছোট ড্রিল হোলকে বড় করা বা নন-স্ট্যান্ডার্ড হোল তৈরি করা হয়ে থাকে। নিচে একটি বোরিং বারের ছবি দেওয়া হয়েছে।

ড্রিল, ট্যাপ এবং রিমার

ওয়ার্কপিসের উপর হোল করার জন্য সাধারনত ড্রিল, ট্যাপ বা রিমার ব্যাবহার করা হয়। ড্রিল বিভিন্ন প্রকারের হয়ে থাকে, যেমন টুইস্ট ড্রিল, স্পট ড্রিল, সেন্টার ড্রিল এবং ইন্ডেক্সেবল ড্রিল। এগুলির মধ্যে টুইস্ট ড্রিলই সবথেকে বেশী ব্যাবহৃত হয়। টুইস্ট ড্রিলের কাটিং পয়েন্ট কোনিক্যাল (conical cutting point) হয় এবং তাতে এক বা তার অধিক হেলিক্যাল ফ্লুট (Helical Flute) থাকে, যাতে ড্রিলিং এর ফলে উৎপন্ন চিপস সহজেই ওই হেলিক্যাল ফ্লুটের মধ্যে দিয়ে ড্রিল-হোল থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে। টুইস্ট ড্রিলকে সাধারনত টাইটানিয়াম নাইট্রাইডের কোটিং দেওয়া হয়, যাতে সেটি সহজেই ভেঙ্গে না যায়। স্পট ড্রিলের সাহায্যে ওয়ার্কপিসের উপরে ছোট স্পট হোল করা হয় যাতে টুইস্ট ড্রিলকে সহজেই চালনা করা যায়। সেন্টার ড্রিল ব্যাবহার করা হয় টার্নিং মেশিনের ওয়ার্কপিসের প্রান্তে 60 ডিগ্রি সেন্টার করার জন্য। ইন্ডেক্সেবল ড্রিলে সাধারনত দুটি ফ্লুটযুক্ত একটি হোল্ডারের মধ্যে দুটি কার্বাইড ইনসার্ট লাগানো হয়। নিচে বিভিন্ন ধরনের ড্রিলের ছবি দেওয়া হল।

 

ওয়ার্কপিসের ড্রিল হোলের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট পিচের (Pitch) ইন্টার্নাল থ্রেড করার জন্য ট্যাপ (Tap) ব্যাবহার করা হয়। ট্যাপ বিভিন্ন ধরনের হয় যেমন হ্যান্ড ট্যাপ, স্পাইরাল পয়েন্ট ট্যাপ, স্পাইরাল ফ্লুট ট্যাপ, ফর্ম বা রোল ট্যাপ ইত্যাদি। CNC মেশিনে ট্যাপকে ওয়ার্কপিসের সাথে সিঙ্কোনাইজড রোটেশানের মাধ্যমে সঠিক ইন্টার্নাল থ্রেড করার জন্য ব্যাবহার করা হয় এবং সঠিক থ্রেড পাওয়ার জন্য ট্যাপকে বারংবার চালানোর হয়।

আগে থেকে করা কোন ড্রিল-হোলকে খুব সুক্ষ টলারেন্সে তৈরি করার জন্য রিমারের সাহায্য নেওয়া হয়। রিমারের সাহায্যে ড্রিল-হোল থেকে খুব সামান্য পরিমানের মেটেরিয়ালকে রিমুভ করা হয় এবং এর ফলে খুব সুন্দর সারফেস ফিনিশ পাওয়া যায়। তাই রিমারকে ব্যাবহার করা হয় মূলত ওয়ার্কপিসের ওপর কোন হোলের সঠিক ডায়ামিটার, সঠিক রাউন্ডনেস এবং সুন্দর সারফেস ফিনিশের জন্য। রিমার বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে যেমন স্ট্রেইট ফ্লুট, হেলিক্যাল ফ্লুট, ট্যাপার ইত্যাদি। নিচে ট্যাপ এবং রিমারের ছবি দেওয়া হল।

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Popular Posts